ইসতিয়াক আহমেদ তাহের
বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। একটি ফুড ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির এইচআর ম্যানেজার আমাকে ফোন করে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির কথা জানালেন। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে, যার মধ্যে দুধ দিয়ে তৈরি বেশ কিছু ডেইরি পণ্যও রয়েছে।
একদিন হঠাৎ তাদের ফ্যাক্টরি কম্পাউন্ডের ভেতরে একটি সাপ ধরা পড়ল। জায়গাটি মূল ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটি থেকে কিছুটা দূরে হলেও সেটি ফ্যাক্টরির সীমানার মধ্যেই। স্বাভাবিকভাবেই ঘটনাটি কর্মীদের মধ্যে বেশ কৌতূহল এবং কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি করল।
এরই মধ্যে একজন কর্মী মৃত সাপটির ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলেন। ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনার সঙ্গে মজার ছলে লিখলেন:
“দুধ থাকিলে সাপ তো আসিবেই!”
আপাতদৃষ্টিতে পোস্টটি একেবারেই নিরীহ। সম্ভবত কর্মীটি নিছক রসিকতা বা আনন্দের জন্যই এটি করেছিলেন। কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার কোনো উদ্দেশ্য হয়তো তাঁর ছিল না।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন কর্মীর কাছে যা নিছক একটি মজার ফেসবুক পোস্ট, প্রতিষ্ঠানের কাছে সেটিও কি শুধুই মজা?
একজন ভোক্তার দৃষ্টিতে বিষয়টি ভাবা যাক। তিনি যদি ছবিটি দেখে বুঝতে পারেন যে সাপটি একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ফ্যাক্টরি কম্পাউন্ডে পাওয়া গেছে, তাঁর মনে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, “এই ফ্যাক্টরিতে সাপ ঘোরাফেরা করে? এখানকার তৈরি পণ্য আমি এবং আমার সন্তান খেয়ে থাকি ! তাহলে এই পণ্য আসলেই কতটা নিরাপদ?”
এখানেই শেষ নয়। পোস্টটি যদি সংশ্লিষ্ট ফুড সেফটি কর্তৃপক্ষ কিংবা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণকারী কোনো সংস্থার নজরে আসে, তারাও বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের প্রয়োজন মনে করতে পারে। পরিস্থিতি ও প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা দেওয়া, পরিদর্শনের মুখোমুখি হওয়া কিংবা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ও আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
অর্থাৎ, একজন কর্মীর কাছে যে পোস্টটি ছিল কয়েক মুহূর্তের নিছক রসিকতা, সেটিই প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি করতে পারে সুনামগত, বাণিজ্যিক, নিয়ন্ত্রক এবং এমনকি আইনি ঝুঁকি।
আর এখানেই বর্তমান কর্মক্ষেত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে, একজন কর্মীর ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের স্বাধীনতা কোথায় শেষ হয়, আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও সুনাম রক্ষার দায় কোথা থেকে শুরু হয়?
তাই ইদানীং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের HR পেশাজীবী ও মালিকপক্ষের কাছ থেকে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শুনছি:
“আমাদের একজন কর্মীর সোশ্যাল মিডিয়ার কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?”
এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে আমার প্রথম প্রশ্নটি সাধারণত হয়, “আপনাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য কোনো Social Media Usage Policy আছে কি?” অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্মী কি আগে থেকেই জানতেন যে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী, গ্রাহক, ব্যবস্থাপনা কিংবা কর্মক্ষেত্র-সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে তিনি কী বলতে বা শেয়ার করতে পারবেন এবং কোনটি পারবেন না?
দুঃখজনকভাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না।
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বন্ধ করা কি বাস্তবসম্মত?
বর্তমান ডিজিটাল যুগে কর্মীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা বাস্তবসম্মত নয়। এমনকি প্রতিষ্ঠান যদি নির্দেশনাও দেয়, “অফিসে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা যাবে না” – এই নির্দেশের শতভাগ বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব। কারণ, একজন কর্মী তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, ট্যাব বা অন্য কোনো ডিভাইস এবং নিজের মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে কী দেখছেন, লিখছেন বা শেয়ার করছেন, তা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়।
তাই প্রশ্নটি “কর্মী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন কি না” এটি নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “একজন কর্মী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার সময় তার প্রতিষ্ঠান ও কর্মজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোন সীমারেখাগুলো মেনে চলবেন?”
এখানেই প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট Social Media Usage Policy ।
একটি কার্যকর পলিসিতে কর্মীদের নিম্নোক্ত বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত:
- প্রতিষ্ঠান-সম্পর্কিত কোন তথ্য প্রকাশ বা শেয়ার করা যাবে না;
- প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থাপনা, সহকর্মী, গ্রাহক বা অন্যান্য Stakeholder সম্পর্কে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে কী সীমাবদ্ধতা থাকবে;
- গোপনীয় বা ব্যবসায়িক তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে;
- ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের সময় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে;
- কোন ধরনের পোস্ট, মন্তব্য, ছবি, ভিডিও বা অনলাইন আলোচনায় অংশগ্রহণ প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মী, উভয়ের জন্যই সুনামগত বা আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পলিসি না থাকলে ঝুঁকি দুই পক্ষেরই
প্রথমত, কর্মীর ঝুঁকি: সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে একজন কর্মী হয়তো জানতেই পারবেন না যে কোন তথ্য প্রকাশ, মন্তব্য বা অনলাইন আলোচনায় অংশগ্রহণ তার নিজের কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য সুনামগত বা আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি: কর্মীর প্রতি দিক-নির্দেশনার অভাবে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হওয়া এবং আইনী জটিলতার পাশাপাশি কোনো কর্মীর অনাকাঙ্ক্ষিত সোশ্যাল মিডিয়া আচরণের কারণে প্রতিষ্ঠান যদি তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ disciplinary procedure শুরু করতে চায়, তবে আগে থেকে সুস্পষ্ট নীতিমালা, আচরণবিধি ও যথাযথভাবে communicated expectations না থাকলে সেই ব্যবস্থার ন্যায্যতা ও আইনগত ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
.

.
শ্রম আইনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার সময় এসেছে
একই সঙ্গে আমি শ্রম মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিও এ বিষয়ে আকর্ষণ করতে চাই। আমাদের কর্মক্ষেত্র দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক এখন আর শুধু অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; একজন কর্মীর একটি Facebook post, LinkedIn comment কিংবা অন্য কোনো অনলাইন activity মুহূর্তের মধ্যেই তার কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। অথচ সোশ্যাল মিডিয়ায় কর্মী ও নিয়োগকর্তার আচরণ, অধিকার, দায়িত্ব এবং সীমারেখা নিয়ে আমাদের শ্রম আইন ও বিধিমালায় আরও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে। আমার মতে, সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি, HR ও আইন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণে এ বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত guideline তৈরি করার সময় এসেছে।
কারণ, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু এর দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা অবশ্যই সম্ভব।
সবশেষে বলতে চাই, ডিজিটাল কর্মপরিবেশে Social Media Usage Policy এখন আর ঐচ্ছিক কোনো HR Policy নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠানের Risk Management এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কর্মীর কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করার আগে প্রতিষ্ঠানকেও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নয়। একই সঙ্গে কর্মীর ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম, গোপনীয়তা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি, কার্যকরভাবে তা Communicate করা এবং কর্মীদের সচেতন করাই হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের প্রথম পদক্ষেপ। পাশাপাশি, পরিবর্তিত কর্মপরিবেশের বাস্তবতা বিবেচনায় এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়েও সুস্পষ্ট আইনগত দিকনির্দেশনা এখন সময়ের দাবি।
.
ইসতিয়াক আহমেদ তাহের একজন মানব সম্পদ ও শ্রম আইন বিষয়ক পরামর্শক এবং ঢাকা শ্রম আদালত – ১ এর একজন সদস্য ।
