ইসতিয়াক আহমেদ তাহের
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। ফলে এই খাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকে পরিচালিত সামাজিক, নৈতিক এবং কমপ্লায়েন্স অডিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই আমাকে ভাবিয়ে তুলছে:
যারা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রম আইন ও কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা করেন, তাদের আইনী যোগ্যতা বা পেশাগত সক্ষমতার মানদণ্ড আসলে কী?
গত দুই দশক ধরে পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে আমি শ্রম আইন, শিল্প সম্পর্ক (Industrial Relations) এবং কমপ্লায়েন্স বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অনেক প্রথিতযশা আইনজীবী, শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ, মানবসম্পদ (HR) পেশাজীবী এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে একটি বিষয় বারবার আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে , আর তা হল অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী অডিটররা বাংলাদেশের শ্রম আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না রেখেই বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেন, যা শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং কখনও কখনও অন্যায্য দাবি এবং অপ্রয়োজনীয় চাপেরও সৃষ্টি করে।
শ্রম আইনের ভুল ব্যাখ্যা: একটি বাস্তব উদাহরণ
সম্প্রতি একটি পেশাগত ফোরামে একজন HR Manager অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তিনি জানান, একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অডিটর তার কারখানায় এসে দাবি করেন যে নারী শ্রমিকদের ছয় (৬) মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হবে।
এই দাবিটি শুনে আমি বিস্মিত হই।
কারণ বাংলাদেশের বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী একজন যোগ্য নারী শ্রমিক ১২০ দিনের মাতৃত্বকালীন ছুটির অধিকারী। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় (৬) মাস। এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি কাঠামো। শ্রম আইন নিয়ে ন্যূনতম কাজ করেন এমন একজন পেশাজীবীরও এ পার্থক্য সম্পর্কে অবগত থাকার কথা।
এখানে প্রশ্নটি হলো, যিনি একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের হয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের আইনগত কমপ্লায়েন্স মূল্যায়ন করতে এসেছেন, তিনি যদি সংশ্লিষ্ট দেশের মৌলিক শ্রম আইনই সঠিকভাবে না জানেন, তাহলে তার পর্যবেক্ষণের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?
শুধু ভুল ব্যাখ্যাই নয়, রয়েছে অনৈতিক আচরণের অভিযোগও ।
সমস্যা শুধু শ্রম আইনের ভুল ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো কিছু অডিটরের আচরণ।
কয়েক বছর আগে একটি পেশাগত আলোচনায় একজন কারখানার HR কর্মকর্তা জানান, এক অডিটর ঈদুল আজহার আগে তাকে ফোন করে অনুরোধ নয়, বরং কার্যত নির্দেশের সুরে বলেন যে তিনি কোরবানির জন্য গরু কিনবেন এবং সেই গরুটি হাট থেকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য কারখানা থেকে দুইজন শ্রমিক পাঠাতে হবে।
এ ধরনের দাবি কোনোভাবেই পেশাগত সম্পর্কের মধ্যে পড়ে না। বরং এটি স্পষ্টভাবে Conflict of Interest, Abuse of Position এবং Professional Misconduct-এর উদাহরণ।
শুধু এই ঘটনাই নয়। আপনি যদি পোশাক শিল্পে কর্মরত HR, Compliance অথবা Sustainability পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে আরও অসংখ্য অভিজ্ঞতা শুনতে পারবেন। যেমন:
- অডিট চলাকালে কারখানার কর্মকর্তাদের প্রতি অপ্রয়োজনীয় রূঢ় ও অপমানজনক আচরণ।
- স্থানীয় আইন যাচাই না করেই ব্যক্তিগত মতামতকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা।
- আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (Code of Conduct) এবং বাংলাদেশের আইন, এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করা।
- অডিটের বাইরের ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের চেষ্টা বা অযৌক্তিক অনুরোধ করা।
- পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া পর্যবেক্ষণ (Observation) বা Non-compliance রিপোর্ট করা, যার ফলে কারখানা অযথা চাপের মুখে পড়ে।
অবশ্যই আমি বিশ্বাস করি, সব অডিটর এমন নন। অনেক আন্তর্জাতিক অডিটর অত্যন্ত দক্ষ, জ্ঞানসম্পন্ন এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনার কারণেই পুরো অডিট ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সমস্যার মূল কোথায় ?
আমার দৃষ্টিতে এ ধরনের সমস্যার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে:
প্রথমত, বাংলাদেশের কোনো পোশাক কারখানায় শ্রম আইন বা কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনার জন্য একজন অডিটরের কী ধরনের আইনী জ্ঞান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ বা পেশাগত দক্ষতা থাকতে হবে, এ বিষয়ে কোনো জাতীয় মানদণ্ড বা নিয়ন্ত্রক কাঠামো নেই।
দ্বিতীয়ত, অডিট চলাকালে এবং অডিটের আগে ও পরে অডিটরদের আচরণ কেমন হবে, কোন বিষয়গুলো গ্রহণযোগ্য এবং কোনগুলো পেশাগত অনৈতিকতা হিসেবে বিবেচিত হবে, এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক কোনো Code of Conduct বা আচরণবিধি নেই।
এখন আমাদের করনীয় কি ?
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে আমি মনে করি শ্রম মন্ত্রণালয়, Bangladesh Employers’ Federation (BEF) BGMEA, BKMEA এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর যৌথ উদ্যোগে অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
১. ফ্যাক্টরি অডিটরদের জন্য বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা: যেভাবে অনেক পেশায় নির্দিষ্ট যোগ্যতা ছাড়া কাজ করার সুযোগ নেই, তেমনি শ্রম আইন ও কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনার ক্ষেত্রেও একটি পরীক্ষাভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
এই ব্যবস্থায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি:
- বাংলাদেশ শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সম্পর্কে নির্ধারিত জ্ঞান যাচাই করা হবে।
- আন্তর্জাতিক শ্রম মান (ILO Standards), মানবাধিকার, নৈতিক অডিটিং এবং পেশাগত নীতিশাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- প্রতি তিন বছর অন্তর লাইসেন্স নবায়নের জন্য Continuing Professional Development (CPD) বা পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকবে।
- বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কেউ বাংলাদেশে শ্রম আইনভিত্তিক ফ্যাক্টরি অডিট পরিচালনা করতে পারবেন না।

২. অডিটরদের জন্য বাধ্যতামূলক Code of Conduct বা একটি সুস্পষ্ট আচরণবিধিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে যা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করবে:
- সততা, নিরপেক্ষতা ও পেশাগত স্বাধীনতা।
- স্থানীয় আইন ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা।
- কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ।
- ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ বা স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
- সব পর্যবেক্ষণ তথ্য-প্রমাণভিত্তিক হওয়া।
- অডিট চলাকালীন এবং অডিট-পরবর্তী যোগাযোগের নীতিমালা নির্ধারণ।
- আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান।
পরিশেষে বলতে চাই, এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, অডিট প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সমালোচনা করা নয়। বরং বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী শিল্পের স্বার্থে একটি আরও পেশাদার, জ্ঞানভিত্তিক, ন্যায়সঙ্গত এবং জবাবদিহিমূলক অডিট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। অডিটের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কারখানাকে শাস্তি দেওয়া নয়; বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা, ঝুঁকি চিহ্নিত করা এবং ধারাবাহিক উন্নয়নে সহায়তা করা। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন এমন অডিটর, যিনি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড সম্পর্কে দক্ষ এবং সর্বোপরি পেশাগত নৈতিকতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। আমি আশা করি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, BEF, BGMEA, BKMEA, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, অডিট প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। একটি দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক অডিট ব্যবস্থা শুধু কারখানার স্বার্থেই নয়; বরং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, সুনাম এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসতিয়াক আহমেদ তাহের একজন মানব সম্পদ, শ্রম আইন বিষয়ক পরামর্শক ।

আরএমজি খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে অডিট ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ এবং বাস্তবসম্মত করা সময়ের দাবি। এই লেখায় যে দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে, তা সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সচেতন করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
আইনগত বিষয়ে তাদের কিছু ব্যাখ্যা বরাবরই অতিরঞ্জিত। তার থেকেও বড় বিষয় হলো অডিটরদের সাথে কোন কথাই বলতে চান না ভয়ে। এছাড়াও একটি বিষয় লক্ষনীয়ভাবে দৃষ্টি গোচর হয় কমপ্লায়েন্স ডিপার্টমেন্টের প্রফেশনালগণ বার্গেডিং এ যেতে চান না পাছে কোন রিপোর্ট খারাপ হয় ভয়ে।
আরও অনেক সমস্যাই বিদ্যমান যা এখানে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয়।
সমস্যা হল, অডিটররা নিজেদের ঈশ্বরের সমপর্যায়ের মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের মনোবৃত্তি দেখান। তদুপরি, অডিটরকে প্রায় কখনো ও কোথাও জবাবদিহিতা দিতে হয় না। কোনো ফোরামে তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবার কোনো স্কোপ রাখা হয়নি। সর্বোপরী, একটি বড় সংখ্যক ক্ষেত্রেই অডিটরের লোভনীয় জবগুলোতে কমপ্রোমাইজড ও ম্যানিপুলেটেড হায়ারিং হয়। তারা এমনিতেও যোগ্য থাকেন না। ওদিকে, কারখানাগুলোরও নানা লুপহোল থাকে, যেজন্য তারাও খুব স্ট্রংলি ডিফেন্ড করেন না। সব মিলিয়ে একটা হচপচ।