ইসতিয়াক আহমেদ তাহের
[আমাদের ক্যারিয়ারে এমন সময় আসতে পারে যখন পেশার সাথে ব্যক্তিগত মূল্যবোধ বা নৈতিকতার সংঘাত তৈরি হয়। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব।]
একজন পেশাজীবী হিসেবে আমরা বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকলেও আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু ব্যক্তিগত নৈতিক বা চারিত্রিক মুল্যবোধ থেকে থাকতে পারে । একজন নীতিবান মানুষ হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা এসকল বিষয়ে ছাড় দিতে চাই না, যা খুবই স্বাভাবিক। এছাড়া জীবনের চলার পথে বিভিন্ন সময়ে, বয়সে বা ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা বা অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের এসকল মুল্যবোধে পরিবর্তন আসতে পারে । তাই এতদিন যা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা আপনার কাছে আর গ্রহণযোগ্য নাও থাকতে পারে । তাই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, আপনার ব্যক্তিগত নৈতিক মানদণ্ড বা ধর্মীয় মুল্যবোধের সাথে আপনার বর্তমান চাকরি বা পেশা যদি সাংঘর্ষিক হয়, তবে করনীয় কি ?
প্রথমেই বলে নেই যে চাকরি হারাম-হালাল বা নৈতিক বা অনৈতিক – এ বিষয়ে বিশেষ কোন খুতবা বা জ্ঞান দেয়ার জন্য আমি আজকের এ লেখাটি লিখছি না । কোন সোর্স থেকে ইনকাম হারাম না হালাল কিংবা নৈতিক বা অনৈতিক এ বিষয়ে আমার সামান্য কিছু জ্ঞান থাকলেও, এ সকল বিষয়ে কোন ফতোয়া বা জ্ঞান দেয়ার যোগ্যতা বা ইচ্ছা কোনটাই আমার নেই । তাই আমার এই লেখা পড়ে আপনি যদি মনে করে থাকেন যে আপনার কোন চাকরি করা উচিত বা উচিত না সে বিষয়ে আমি জ্ঞান দান করছি, তবে আমার মতে আপনি আমার বিষয়ে সঠিক চিন্তা করছেন না । তবে একই সাথে আমি আপনার ব্যক্তিগত মতাদর্শ বা মত প্রকাশের অধিকারের বিষয়ে আমার পুর্ণ সমর্থন জানাই ।
যা হউক, মুল আলোচনায় আসি ।
আমার এক পরিচিত ব্যক্তির সন্তান বিদেশে সফটওয়্যার ইন্জনিয়ার হিসেবে একটি খুব ভাল চাকরি পেয়ে সাংঘাতিক খুশি । কোম্পানির বিশাল সুপরিচিত এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডের সাথে সাথে অসাধারণ কর্ম পরিবেশ এবং উচ্চ বেতন পেয়ে সে নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করল, যা খুবই স্বাভাবিক । প্রথম দিকে কাজের বৈচিত্র এবং চ্যালেন্জ নিয়েও সে বেশ উৎফুল্ল ছিল । কিন্ত কিছুদিন কাজ করার পর সে বুঝতে পারল যে সে যে সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করছে তা একটি অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র তৈরীর কাজে ব্যবহার হবে । এবং এই সকল অস্ত্র ব্যবহারের ফলে অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রান হারাচ্ছে বা ভবিষ্যতেও হারাবে । এ বিষয়টি জানার পর থেকেই সে নিজের কাজ নিয়ে খুব মর্মপীড়ায় ভুগতে লাগল এবং কাজে একেবারেই মনোনিবেশ করতে পারছিল না। বেশ কিছুদিন নিজের বিবেকের সাথে যুদ্ধ করার পর সে অসম্ভব লোভনীয় এই চাকরি টি ছেড়ে দিল ।
এবার এ বিষয়ে আমাদের দেশের কি অবস্থা সে বিষয়ে একটু আলোচনা করা যাক । একজন এক্সিকিউটিভ রিক্রুটার হিসেবে কাজ করতে যেয়ে এ বিষয়টি আমাকে প্রায়ই মোকাবেলা করতে হয় ।
যেমন ধরুন, একজন ব্যক্তি কোন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লম্বা সময় ধরে কাজ করছেন এবং ক্যারিয়ারে বেশ ভাল করেছেন । কিন্ত, যে কোন কারনেই হউক, হঠাৎ তার মনে হল যে, “আমি তো সুদ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি এবং আমার রুজি কি আদৌ হালাল হচ্ছে ?” কঠিন প্রশ্ন ! কিন্ত এ নিয়ে তার এখন ভীষণ মর্মপীড়া শুর হয়েছে এবং তিনি যে কোন উপায়েই এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চান, অর্থাৎ চাকরি পরিবর্তন করতে চান।
আবার ধরুন আর একজনের ঘটনা ।
তিনি সিনিয়র লেভেলে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে যেয়ে এক পর্যায়ে বুঝতে পারলেন যে ঐ কোম্পানির মালিকপক্ষ মুলত ব্যবসাকে সামনে রেখে ব্যাপক হারে বিদেশে টাকা পাচার করছে । ব্যবাসাটা একটা খোলস মাত্র । এটা বুঝতে পারার পড় থেকে তার মধ্যে দুইটি বড় ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরী হল । প্রথমত, যেহেতু তিনি সিনিয়র লেভেলে কাজ করছেন, তিনি নিজেও এই বেআইনি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জডিয়ে যেতে পারেন এবং দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের সম্পদ পাচার রোধ করতে না পেরে তিনি মানষিক যন্ত্রণায় ভুগতে লাগলেন । এক পর্যায়ে মালিক পক্ষের একজনকে যখন তিনি এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেন, তার সদম্ভ জবাব, “কোম্পানির মালিক কি আমি না আপনে ?” এর পরে কি আর সেখানে চাকরি করা যায় ?
এখন আসি এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন পেশাজীবী হিসেবে আপনি কি করতে পারেন ? প্রশ্ন সহজ, কিন্ত এর কোন সঠিক বা সরাসরি কোন সমাধান নেই !
তবে আমার মতে, যদি কোনো পর্যায়ে একজন পেশাজীবী বুঝতে পারেন যে তার কাজ বা পেশা তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ বা নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তখন বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে এমন অসামঞ্জস্য মেনে চললে তা মানসিক চাপ, হতাশা ও কর্মে অপ্রত্যাশিত ভুলের কারণ হতে পারে।
পেশাগত জীবনে এ ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে, প্রথমে তাকে পরিষ্কারভাবে বুঝার চেষ্টা করতে হবে যে তার কাজের কোন দিকটি তার মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি স্বাস্থ্য-সচেতন ব্যাক্তি হন, অথচ এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন যেখানে এমন কিছু পণ্য তৈরী হয় যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর, তবে তার মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। একইভাবে যদি তার গভীর বিশ্বাস থাকে যে তার চাকরির ধরন তার ধর্মীয় মুল্যবোধের সাথে সম্পুর্ণভাবে সাংঘর্ষিক, তবে তা উপেক্ষা করা ও তার জন্য সহজ হবে না ।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে, বিষয়টি নিজের ম্যানেজার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিংবা নিজের পরিবার বা বিশ্বাসযোগ্য এমন কোন ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করা। হয়তো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কিছু পরিবর্তনের সুযোগ আছে, অথবা অন্য কোন পদ বা রোল আছে যেখানে সেই সংঘাত কম। যদি তাতেও সমাধান না আসে, তবে ধীরে ধীরে বিকল্প ক্যারিয়ার পথ বা নতুন কর্মক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হওয়াই হয়তোবা একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান । “ধীরে ধীরে” বললাম এই কারনে যে, পুরোপুরি না ভেবে জোশের বসে হঠাৎ করে চাকরি ছেড়ে দিলে আপনার এবং আপনার পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে । এবং আপনার যদি এ অবস্থা মোকাবেলা করার মত মানষিক, বাস্তবিক বা ঈমানি প্রস্ততি না থাকে, তবে আপনি আপানার পরিবারকে বিপদে ফেলে দিতে পারেন । তবে আপনার যদি মনে হয় যে, এ চাকরিতে থাকলে আপনি বেআইনি কাজে জড়িয়ে যেতে পারেন কিংবা আপনার আত্মসম্মান চরমভাবে বিঘ্নিত হবে, তবে সেখানে অযথা ঝুলে থাকাই আপনার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে ।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন মার্কেটিং প্রফেশনাল দেখলেন তার প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এটি তার ব্যক্তিগত নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি প্রথমে বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের জানালেন এবং বিকল্প মার্কেটিং কৌশল প্রস্তাব করলেন। যদি তার প্রস্তাব গুরুত্ব না পায়, তবে তিনি এমন প্রতিষ্ঠানে চাকরি খুঁজতে শুরু করবেন যেখানে সত্যনিষ্ঠ এবং স্বচ্ছ বিপনন প্রক্রিয়াকে মূল্য দেওয়া হয়।
কিন্ত আপনার প্রতিষ্ঠানের কাজের বা সম্পুর্ণ ব্যবসার ধরনই যদি আপনার মুল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয় এবং আপনি যদি এ বিষয়ে আর কোন ধরনের ছাড় না দেয়ার বিষয়ে অনড় থাকেন, তবে বিকল্প চাকরি বা পেশা দেখা ছাড়া আপনের হাতে আসলে অন্য কোন অপশন আর থাকছে না ।
তবে আমি আগেই বলেছি, হালাল-হারামের ফতোয়া দেয়া বা নৈতিক বা অনৈতিক – এ বিষয়ে জ্ঞান দেয়া আমার কাজ বা উদ্দেশ্য না । কিন্ত এদেশের জব মার্কেটের বাস্তবতা হল, মিড-ক্যারিয়ার ট্রানজিশন এখানে খুব সহজ কাজ না । এদেশের চাকরি বাজারে আমরা সব পেশাজীবীদেরক্ টাইপকাস্ট বা ব্র্যাকেট-বন্ধি করে ফেলি, যেমন:
“আপনি তো এফএমসিজি সেলসের লোক, আমরা তো বিজনেস ডেভেলপমেন্টের লোক খুঁজছি !”
“আপনি তো মেরিন ইন্জিনিয়ার । আপনি বরং আমাদের ফ্যাক্টরিতে না যেয়ে আমাদের শিপিং কোম্পানিটা দেখাশুনা করেন !”
“আপনি তো ব্যাংকের লোক । আমাদের কর্পোরেট ফিন্যান্সের ব্যাপার সম্পুর্ণ অন্যরকম । আপনি পারবেন না ।”
আদার ব্যাপারীর কাছেও পেতে পারেন জাহাজের খবর : মানব সম্পদ উন্নয়ন কৌশল
তাই যে সকল পেশাজীবী এরকম মিড-ক্যারিয়ার সংশয়ে ভুগছেন তাদেরকে তাদের এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এইচআর পেশাজীবী, হায়ারিং ম্যানেজার এবং অবশ্যই মালিকপক্ষকে আরও বেশী উদার মনোভাব সম্পন্ন হতে হবে । কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল, “Hire for Attidue and Train for Skills” ! তাই আপাত দৃষ্টিতে ক্যারিয়ারে মাঝে এসে দিক পরিবর্তন করতে চাওয়া একজন ব্যক্তিকে আপনার কাছে Incompatible মনে হতে পারে, কিন্ত আপনি তার চারিত্রিক দৃঢ়তার বিষয়টিকে যদি প্রাধান্য দিয়ে তাকে কাজের সুযোগ দিতে পারেন, তবে এ ধরনের একজন কর্মী আপনার এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন এবং সঠিক সুযোগ পেলে তিনি আপনার প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন ।
তবে এখানে পেশাজীবীদের ও কিছু দায়িত্ব আছে । পেশাজীবনের শুরুতে শুধুমাত্র এম্প্লয়ার ব্র্যান্ড, সুযোগ-সুবিধা বা পদমর্যাদা দেখেই পেশা বা চাকরি নির্বাচন করা ক্যারিয়ারের জন্য সঠিক পদক্ষেপ নয় । এ বিষয়ে তরুন পেশাজীবীদের অনেক বেশী সচেতন হওয়া উচিত । দীর্ঘ মেয়াদে যদি আপনার ব্যক্তিগত মুল্যবোধের সাথে আপনার পেশার ধরন সাংঘর্ষিক হয়, তবে সে পেশায় বা চাকরিতে না যাওয়াই হবে সঠিক পদক্ষেপ। আর যদি ঝোঁকের বসে বা ভুলক্রমে ভুল পেশায় ঢুকেও পড়েন, তবে সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে আসাটাই বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে । কারন, আপনি কোন কাজে বা পেশায় যত বেশী সময় ব্যায় করবেন, হঠাৎ করে তা ছেড়ে আসা আপনার কাছে ঠিক ততটাই কঠিন হতে পারে ।
সব শেষে বলা যায়, নৈতিক মানদণ্ড ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ রক্ষা করা একজন মানুষের আত্মমর্যাদা ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার সন্তুষ্টির জন্য অপরিহার্য। তাই প্রয়োজনে কঠিন হলেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তবে এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িতে দিতে হবে । তবেই আমাদের দেশের কর্মক্ষেত্রগুলো আরও বেশী গতিশীল, বৈচিত্রময় এবং কর্মী-বান্ধব হয়ে উঠবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ॥
ইসতিয়াক আহমেদ তাহের একজন মানব সম্পদ ও শ্রম আইন বিষয়ক পরামর্শক ।

At any stage of your career, you might face such dilemma situations. You have to be smart enough to navigate such situations sometimes by avoiding, adapting, sacrificing, protesting, looking for alternatives, and other ways. You might have more than one such issue. In such cases, you need to prioritize, choose, and handle the issues wisely.
Very well written.
Thank you.
I’m not sure about other sectors, but in the sustainability field it’s quite difficult for people who truly believe in ethics. At the end of the day, everything seems to come down to business and cost management 🤣. When we try to point out the gaps, violations of laws, or the deception faced by workers, management still acts as if the grass is greener on the other side. Earlier, I even considered changing jobs because it was continuously hurting my ethics and values.