ইসতিয়াক আহমেদ তাহের
সম্প্রতি ম্যারিকো বাংলাদেশ লি: এর বিরুদ্ধে তার প্রাক্তন কর্মীরা শ্রম আইন অনুযায়ী Worker’s Profit Participation Fund (WPPF) সংক্রান্ত তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাওয়ার জন্য মামলা করেছেন । তাদের অভিযোগ ম্যারিকো বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২৩৪ ধারা অনুযায়ী শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন বাধ্যতামূলক হলেও ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ২০০৬-০৭ অর্থবছর থেকে ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই তহবিল গঠন করা থেকে বিরত থাকে।

উক্ত রীট মামলায় ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড শ্রমিকদের সাথে চলমান মামলা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৮২২.৯৮ কোটি টাকা ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড এর ভারতীয় মূল প্রতিষ্ঠান ম্যারিকো লিমিটেড এ প্রেরণ করতে না পারে, অর্থাৎ ১৮২২.৯৮ কোটি টাকা যেন ভারতে প্রেরণ না করতে পারে সে জন্য উক্ত অর্থ ব্লক করার জন্য আদালতের রুল চেয়ে আবেদন করেছেন।
আশাকরি ম্যারিকো বাংলাদেশের এই প্রাক্তন শ্রমিকগন তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাবেন ।
কিন্ত এই সংক্রান্ত আমার আসল বক্তব্যটি একটু ভিন্ন । বাস্তবতা হল, যদিও ম্যারিকো প্রথম ৬ বছর WPPF এর এই অর্থ তার শ্রমিকদের দেয় নাই, কিন্ত ২০১৩ সালের পর থেকে কিন্ত তারা এই অর্থ নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছে । আমার জানামতে গত কয়েক বছরে এই কোম্পানির প্রতিটি কর্মী বছরে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা করে WPPF এর টাকা পেয়ে যাচ্ছে । BTW, আমি ম্যারিকো সাথে এখন পর্যন্ত এক টাকার ব্যবসাও করিনাই । সুতরাং তাদেরকে খুশী করার আমার কেন কোন স্বার্থ বা দায়বদ্ধতা নেই । তবে তাই বলে আমি আবার এটাও বলতে চাইছি না যে প্রথম ছয় বছর তার কর্মীদের WPPF এর টাকা না দিয়ে তারা অন্যায় করে নাই । অবশ্যই এ বিষয়ে তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে ।
কিন্ত আমার প্রথম প্রশ্ন হল, আগের ছয় বছরের পাওনা আদায় না করে সরকার তাদের WPPF গঠন করার অনুমোদন কেন দিল ?
ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ১৮২২.৯৮ কোটি টাকা দাবি করে হাইকোর্টে আবেদন দায়ের
এখানে উল্লেখ্য যে, যেহেতু তারা প্রথম ছয় বছর তাদের কর্মীদেরকে WPPF এর অর্থ দেয় নাই, নিশ্চিতভাবে বলা যায় তারা ঐ ছয় বছর শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় শ্রমিক কল্যান তহবিলেও আইন অনুযায়ী লভ্যাংশের ০.৫০% অর্থ জমা দেয় নাই । তাই আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, তারা যখন ২০১৪ সালে এই জাতীয় শ্রমিক কল্যান তহবিলের অংশ (আগের বছরের লভ্যাংশ) জমা দিতে গেল, তখন শ্রম মন্ত্রনালয় কেন তাদেরকে প্রশ্ন করে নাই যে, “আপনাদের গত ছয় বছরের লাভ্যাংশের টাকা কই ?”
আমার তৃতীয় এবং শেষ প্রশ্ন হল, এসব আইন অমান্যের ক্ষেত্রে আমরা কেন যেন শুধু বিদেশী এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকেই খুঁজে পাই । তার মানে আমাদের দেশী কোম্পানিগুলো কি ধোয়া তুলসি পাতা ? তাদের কর্মীরা কি নিয়মিত WPPF এর পয়সা পেয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতেছে ?
আমার এই তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর আপনারা সবাই খুব ভাল করেই জানেন। বাস্তবতা হল ২০০৬ থেকে বাদই দেন, নিয়মিত লাভ করার পরও এদেশে এরকম অসংখ্য দেশী কোম্পানি আছে যারা এখনও WPPF গঠনই করে নাই, আর তার কর্মীদের এ সংক্রান্ত পাওনা বুঝিয়ে দেয়া তো বহুত দুরের বিষয় । কিন্ত এসব কোম্পানি কিন্ত বহাল তবিয়তেই আছে । দেশের শ্রম মন্ত্রনালয় তাদের খুঁজে ও পায় না ।
আমাদের আর্থিক খাতের ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছর বছর তাদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ডাইরেক্টর এবং শেয়ার হোল্ডারদেরকে মোটা অংকের ডিভিডেন্ড দিলেও এবং শ্রম আইনে WPPF সংক্রান্ত তাদের জন্য কোন ছাড় না থাকা সত্বেও, আজ পর্যন্ত তার কর্মীদের WPPF এর আওতায় এক টাকাও লাভ্যাংশ দেয় নাই । একইভাবে সরকার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ নেয়ার পরও বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের একটি কোম্পানি ও তাদের কর্মীদের একটি টাকাও লভ্যাংশ দেয় নাই । কিন্ত দেশের আইন বা শ্রম মন্ত্রণালয় তাদেরকে দেখে না বা খুঁজেও পায় না ।
মেরিকো বাংলাদেশের ১৮’শ ২০ কোটি টাকা ভারতে পাচার রোধে হাইকোর্টে আবেদন
তাই আমার মুল বক্তব্য হল, বিদেশী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের এই Double Standard দুর করা উচিত । আইনের প্রয়োগ সবার উপরই সমভাবে হওয়া উচিত । চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ভারতের সাথে আমাদের বর্তমান নেতিবাচক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ম্যারিকোর মত কোম্পানিকে জাতীয় Villain বানানোর কোন প্রয়াসকে আমি ব্যাক্তিগতভাবে সমর্থন করি না । তাই বলে আমি তাদেরকে ছেড়ে দিতেও বলছি না । কিন্ত আমার আশা হল, এদেশের হাজারও দেশী (এবং non-compliant বিদেশী) কোম্পানিগুলোকে শ্রম আইনের আওতায় এনে তাদের বর্তমান এবং প্রাক্তন শ্রমিকদেরকেও একইভাবে ২০০৬ সাল থেকে তাদের WPPF এর পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হউক ।
আমাদেরকে এই Selective এবং Discretionary Application of Law থেকে সরে আসতে হবে । তবেই আপনি বলতে পারবেন যে এদেশে প্রকৃতই আইনের শাসন আছে ।
ইসতিয়াক আহমেদ তাহের একজন মানব সম্পদ ও শ্রম আইন বিষয়ক পরামর্শক ।
